বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক রেহানা পারভীন হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত পলাতক আসামি তাঁর স্বামী আওলাদ হোসাইন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে স্ত্রী নিখোঁজ বলে প্রচার করে ফিরে যান অস্ট্রেলিয়ায়। স্ত্রীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে মর্মে জাল মৃত্যু সনদ দেন সে দেশের সরকারি দপ্তরে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। চলতি সপ্তাহে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ। তিনিও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক।

অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের (এএফপি) তদন্তে উঠে এসেছে, স্ত্রীকে হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে ও তদন্ত প্রভাবিত করতে আওলাদ বাংলাদেশের আমলা, পুলিশ ও স্ত্রীর স্বাভাবিক মৃত্যুর সনদদানকারীকে ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার ঘুষ দিয়েছেন। তিনি কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রেহানা পারভীন আওলাদ দম্পতি এবং তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ের সবাই অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। রেহানা পারভীন এক মেয়ে আহাদ নুরকে নিয়ে ২০২৪ সালের ৬ জুন অস্ট্রেলিয়া থেকে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার শোল্লা ইউনিয়নের পশ্চিম পাতিলঝাপ গ্রামে এসেছিলেন। তাঁর বাবার নাম লেহাজ উদ্দিন। একই বছরের ২৯ জুন তাঁর স্বামী আওলাদও দেশে আসেন। পরদিন অন্তস্বত্ত্বা স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে আওলাদ নবাবগঞ্জের বক্সনগরের ছোট রাজাপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে যান। এর তিন দিন পর ৩ জুলাই রেহানা অসুস্থ হলে স্বামী তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেন। এরপর থেকে রেহানা নিখোঁজ ছিলেন।
লেহাজ উদ্দিন বলেন, আওলাদ তাঁদের জানিয়েছিলেন, রেহানা অন্য লোকের সঙ্গে চলে গেছে। আবার কখনো বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেছেন। আওলাদ তাঁদের সঙ্গে আর দেখা না করে ওই বছরের ৭ জুলাই অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বাংলাদেশে থাকা নিজ নাগরিকদের খোঁজখবর নিতে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার সরকার। রেহানার বিষয়ে ঢাকার অস্ট্রেলিয়ার দূতাবাস তাঁর বাবা মায়ের কাছে জানতে চায়। রেহানা নিখোঁজ বলে জানান তাঁর মা। তখন অস্ট্রেলিয়ার সরকার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে জানায়। এর মধ্যে দেশের পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে রেহানার বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে। এদিকে আওলাদ হোসাইন অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বাংলাদেশের একটি হাসপাতালের দেওয়া রেহানার মৃত্যু সনদ দেন। যাতে বলা হয়, রেহানার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি জেনে রেহানার পরিবার আওলাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, রেহানা পালিয়েছেন। এ কথা শুনে তাঁর পরিবার দেশে বিভিন্ন স্থানে খুঁজতে থাকে। ওই বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পুলিশে ব্যাপক রদবদল হয়। রেহানাকে খোঁজা নতুন গতি পায়।

২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রেহানার মা আইরিন আক্তার নবাবগঞ্জ থানায় অপহরণ মামলা করেন। মামলায় আওলাদ হোসাইন, তাঁর দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম এবং চাচা আমজাদ হোসেনকে আসামি করা হয়। পুলিশ পাপিয়া ও আমজাদকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের তথ্যের ভিত্তিতে পাপিয়ার আশুলিয়ার বাড়ির সামনের মাটির নিচ থেকে ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর রেহানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের পর অপহরণ মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। মামলার তদন্ত শেষে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক তানভীর হাসান খান। অভিযোগপত্রভুক্ত পাঁচজন হলেন রেহানার স্বামী আওলাদ, ননদ পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম, আওলাদের চাচাতো ভাই কবির হোসেন এবং চাচা আমজাদ হোসেন। পাপিয়া, কবির ও আমজাদ হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।








