জেলার গারো পাহাড় এলাকায় বন্য হাতি ও মানুষের সংঘাত দিন দিন বাড়ছে। এই সংঘাত নিরসনে বন বিভাগের নজরদারি বৃদ্ধিসহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রশাসনের সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।
বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের প্রশিক্ষক আদনান আজাদ বাসসকে বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাতির নিরাপদে বেঁচে থাকার পরিবেশ গড়ে তুলতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করলে আতঙ্কিত হয়ে হাতিকে ঘিরে ধরা, আঘাত করা কিংবা অনিরাপদভাবে তাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষিত রেসপন্স টিমের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বন বিভাগের সঙ্গে মানুষের সমন্বয় জোরদার করেও এই সংঘাত কমানো সম্ভব।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১২০টি বন্য হাতি বিচরণ করছে। যেখানে প্রতিটি দলে হাতির সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ টি।
এছাড়াও খাদ্যের সন্ধানে হাতির পাল প্রায়ই লোকালয় ও কৃষি জমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে ফসল, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি, বাড়ছে মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি। অন্যদিকে, হাতিরাও হারাচ্ছে নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র ও স্বাভাবিক চলাচলের সুযোগ। ফলে মানুষ ও বন্য হাতি উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র জানায়, জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার কাটাবাড়ি, মধুটিলা ও ঝিনাইগাতী উপজেলার তাওয়াকুচি, ছোটো গজনী ও বড় গজনী এবং শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ী ও রানী শিমুল ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকাসংলগ্ন বনাঞ্চলে হাতির বিচরণ রয়েছে। বর্তমানে হাতির দলগুলো নালিতাবাড়ী উপজেলার বুরুঙ্গা-পোড়াবাড়ি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থান করছে।
মধুটিলা রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. আব্দুল করিম জানান, হাতিগুলো কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় বিচরণ করছে। এসব দলে ২৫ থেকে ৩০টি শাবকও রয়েছে। বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় হাতিরা প্রায়ই কৃষিজমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করছে।
জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে ১৫ থেকে ২০টি বন্যহাতি বাংলাদেশের গারো পাহাড় এলাকায় আসে। পরবর্তী সময়ে বংশ বিস্তারের ফলে হাতির সংখ্যা দিনদিন বাড়তে থাকে। একসময় হাতিগুলো বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে নিয়মিত চলাচল করত।
২০০৭ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মেঘালয় রাজ্য সংলগ্ন শেরপুর এলাকায় কয়েক কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। সেসময় হাতির চলাচলের সুবিধার্থে ৪৪টি গেট ও নদী-ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু, অজানা কারণে সেই গেটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাতির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মেঘালয় থেকে আসা হাতিগুলো আর নিজ আবাসস্থলে ফিরতে পারেনি।
স্থানীয়রা জানান, দিনের আলোয় জমিতে ফসলের পরিচর্যা করেন কৃষকেরা। আর রাত নামলেই শুরু হয় ফসল পাহারা। কেউ টর্চলাইট জ্বালিয়ে, কেউ আগুনের আলো দেখিয়ে, আবার কেউ দল বেঁধে হাঁকডাক করে হাতির পাল ঠেকানোর চেষ্টা করেন। তবুও কোনো কোনো রাতে হাতির আক্রমণে নষ্ট হয়ে যায় কয়েক মাসের পরিশ্রমে ফলানো ফসল।
ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া এলাকার কৃষক সুনীল মারাক বাসসকে বলেন, ‘আমরা কৃষিকাজ করে সংসার চালাই। অনেক কষ্ট করে জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল ফলাই। কিন্তু বন্য হাতি রাতে এসে ক্ষেতের সব ফসল নষ্ট করে দেয়। এক রাতেই আমাদের কয়েক মাসের পরিশ্রম শেষ হয়ে যায়। হাতির ভয়ে রাতে জমি পাহারা দিতে হয়, আবার জীবনের ঝুঁকিও থাকে।’ তিনি হাতির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানান।







