বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম—এ সবই এক ও অবিচ্ছেদ্য সত্তা বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক, কবি ও নজরুল গবেষক আবদুল হাই শিকদার।
তিনি বলেন, নজরুলকে বাদ দিলে বাংলাদেশের আত্মাকেই বাদ দেওয়া হয়। দুধ থেকে যেমন সাদা রং আলাদা করা যায় না, তেমনি বাংলাদেশের অস্তিত্ব থেকেও নজরুলকে আলাদা করা সম্ভব নয়।
সোমবার (২৫ মে) বিকালে নজরুল একাডেমি মাঠে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
আবদুল হাই শিকদার বলেন, একটি জাতির বেঁচে থাকার জন্য যেমন আলো, বাতাস, খাদ্য ও পানির প্রয়োজন, তেমনি বাংলাদেশের জাতিসত্তার এসব উপাদান একত্রে পাওয়া যায় শুধু নজরুলের মধ্যেই। তিনি আমাদের চেতনার প্রতীক, জাতির আত্মার আত্মীয় এবং জাতীয়তাবাদের প্রতিচ্ছবি।
তিনি বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন দেশের জাতীয় কবিদের উদাহরণ টেনে বলেন, ইংল্যান্ডে শেক্সপিয়ার, আমেরিকায় ওয়াল্ট হুইটম্যান, রাশিয়ায় আলেকজান্ডার পুশকিন কিংবা ইরানে ফেরদৌসি—তাদের জাতীয় কবি হওয়ার কারণ হলো তারা নিজ নিজ জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামকে ধারণ করেছেন। একইভাবে নজরুলও বাংলাদেশের জাতিসত্তাকে ধারণ করেছেন বলেই তিনি জাতীয় কবি।
তিনি আরও বলেন, নজরুলের রক্তে পলাশীর ট্র্যাজেডির বেদনা, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের চেতনা, ফরায়েজি আন্দোলনের আত্মত্যাগ এবং ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের আগুন প্রবাহিত হয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আর কোনো কবির মধ্যে এতগুলো ঐতিহাসিক সংগ্রামের চেতনা একসঙ্গে এত প্রবলভাবে প্রকাশ পায়নি।
আবদুল হাই শিকদার বলেন, পলাশীর পর উপমহাদেশের মানুষ দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদল ব্রিটিশদের সহযোগিতার পথ বেছে নেয়, আরেকদল স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করে। নজরুল ছিলেন সেই প্রতিরোধ ও মোকাবিলার ধারার সর্বশেষ উত্তরাধিকার।
নজরুলের পারিবারিক ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, নজরুলের পূর্বপুরুষরা পাটনার বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের পর তাদের পরিবার নিঃস্ব হয়ে চুরুলিয়ায় আশ্রয় নেয়। সেই বঞ্চনা, পরাজয় ও সংগ্রামের ইতিহাসই নজরুলকে বিদ্রোহের কবিতে পরিণত করেছে।
তিনি আরও বলেন, কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু সমাজের রেনেসাঁর বিপরীতে বাংলার প্রকৃত রেনেসাঁ শুরু হয়েছিল নজরুলের জন্মের মধ্য দিয়ে। তিনি ছিলেন পরাজিত, নিপীড়িত ও আত্মপরিচয়হীন একটি জাতির জাগরণের বাতিঘর।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, নজরুল শুধু একজন কবি নন, তিনি বাংলাদেশের আত্মা, চেতনা ও মুক্তির প্রতীক। তাকে কেন্দ্র করেই জাতীয় সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের বিকাশ ঘটেছে।




